মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২ ইং         ০২:৪০ অপরাহ্ন
  • মেনু নির্বাচন করুন

    বন্যার আগেই ধসে গেছে বাঁধ, হুমকির মুখে তিস্তা পাড়ের শতাধিক পরিবার


    প্রকাশিতঃ 14 May 2022 ইং
    শেয়ার করুনঃ


    রাসেল ইসলাম, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ

    গত বছর বন্যার সময় সংস্কার করা বাঁধ চলতি বছর বন্যার আগেই ধসে গিয়ে হুমকীর মুখে পড়েছে লালমনিরহাটের ভুমি অফিসসহ তিস্তাপাড়ের হাজারও বসত বাড়ি।


    জানা গেছে, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ঐতিহাসিক তিস্তা নদী। যা লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রক্ষপুত্র নদের সাথে মিশে যায়। দৈর্ঘ প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার। 


    ভারতের গজলডোবায় বাঁধ নির্মানের মাধ্যমে ভারত সরকার একতরফা তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রন করায় শীতের আগেই বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরুভুমিতে পরিনত হয়। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি প্রবাহের ফলে বাংলাদেশ অংশে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্ঠি হয়। বন্যায় সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তিস্তার বাম তীরের জেলা লালমনিরহাট।


    তিস্তা নদী জন্মলগ্ন থেকে খনন না করায় পলি পড়ে ভরাট হয়েছে নদীর তলদেশ। ফলে পানি প্রবাহের পথ না পেয়ে বর্ষাকালে উজানের ঢেউয়ে লালমনিরহাটসহ ৫টি জেলায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। এ সময় নদী ভাঙ্গন ও বেড়ে যায় কয়েকগুন। প্রতি বছর শুস্ক মৌসুমে নদীর বুকে চর জেগে উঠে। আর বর্ষায় লোকালয় ভেঙ্গে তিস্তার পানি প্রবাহিত হয়। ফলে বসতভিটা ও স্থাপনাসহ ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলিন হচ্ছে। নিঃস্ব হচ্ছে তিস্তাপাড়ের মানুষ।


    পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিবছর বাঁধ নির্মান ও সংস্কারের নামে বরাদ্ধ দিলেও কাজ শুরু করেন বর্ষাকালে। যা সামান্যতে পানির স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার অথৈ পানিতে জরুরী কাজের নামে বরাদ্ধ দেয়া এসব সরকারী অর্থ কোন কাজে আসছেন না নদীপাড়ের মানুষের।


    গত বছর বন্যার সময় লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ গ্রামে নির্মিত বাঁধ সংস্কার করতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যা গত বন্যা পরবর্তি কাজটি সমাপ্ত করা হয়। চলতি বছর বন্যা আসার আগেই গত ৬ মে মধ্যরাতে ৩০ মিটার বাঁধ ধ্বসে যায়। পরে স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে কোন রকম রক্ষা করে।


    স্থানীয়রা জানান, গত বছর বন্যার শেষ দিকে ৫ হাজার জিও ব্যাগ প্রস্তুত করলেও তারাহুড়া করে মাত্র ৪ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে। বাকীসব জিও ব্যাগ তিস্তার চরাঞ্চলেই বালু চাপা পড়ে রয়েছে। রাতে আঁধারে জরুরী কাজের অজুহাতে নামমাত্র কাজ করে চলে যায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে এ বছর বন্যা না আসতেই বাঁধটি প্রায় ৩০/৪০ মিটার এলাকা ধ্বসে যায়। নিজেদের বসতভিটা রক্ষায় রাতেই স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে কিছুটা রক্ষা করেছেন। এটি ভেঙে গেলে খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন ভুমি অফিস ভবন, খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদ, উচ্চ বিদ্যালয় ও খুনিয়াগাছ বাজার তিস্তায় বিলিন হবে। এসব স্থাপনা নদী তীর থেকে মাত্র দেড় দুইশত গজ দুরে।


    বাঁধটির পাশে বসবাস করা আব্দুর রউফ (৭০) বলেন, গত শুক্রবার (৬ মে) মধ্যরাতে হঠাৎ বাঁধটি  ধ্বসে যায়। আমার বাড়ি রক্ষায় গ্রামবাসীকে নিয়ে কিছু বালুর বস্তা ফেলে আপাত রক্ষা করেছি। খবর দিলে উপজেলা চেয়ারম্যানসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসে দেখে গেছেন। জিও ব্যাগ ফেলে সংস্কার করার কথা বলেছেন। কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি নেই। শুস্ক মৌসুমে কাজ না করে বন্যার সময় বরাদ্ধ নিয়ে তারাহুড়া করে নাম মাত্র কাজ করে যাবে। যা আবারও ধ্বসে যাবে। এভাবেই তারা সরকারী অর্থ লোপাট করে। ধ্বসে যাওয়া স্থানে ৫/৬ মাস আগে কাজ করেছে। যা আবার বন্যা না আসতেই ধ্বসে গেছে। তাহলে বুঝেন কাজের মান কেমন হয়েছে।


    একই এলাকার আব্দুর রহিম বলেন, বাঁধ থেকে মাত্র দেড় দুইশত গজ দুরে সরকারী অফিস, স্কুল ও হাট বাজার। নদীর পানি আর একটু বাড়লে ধ্বসে যাওয়া স্থান দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে। তখন সরকারী ভবন, স্কুল আর হাটবাজারসহ হাজার হাজার বসতভিটা বিলিন হবে। তাই দ্রুত বাঁধটি সংস্কার করা দরকার। এসও এসে বলে জিও ব্যাগ প্রস্তুত আছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর নির্দেশ ছাড়া জিও ব্যাগ ফেলা যাবে না। সেই প্রকৌশলী আবার ফোন ধরে না। সবকিছু বিলিন হলে বাঁধ দিয়ে কি লাভ?  শুস্ক মৌসুমে কাজ না করে বন্যার সময় বস্তা ফেলেই বা কি লাভ প্রশ্ন তুলেন তিনি।


    এসব ছোট ছোট বাঁধ না দিয়ে তিস্তা নদী ভাঙন ও বন্যা থেকে রক্ষায় ভিন্ন দাবি তুলেন ওই গ্রামের আব্দুর রশিদ। তিনি বলেন, রাস্তা না পেলে পানি তো নদীর পাড় ভেঙে যাবেই। তিস্তা নদী তো কখনই খনন করা হয়নি। তাই নদীটি খনন করে দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ করলে একদিকে যেমন বন্যা আর ভাঙন থেকে রক্ষা হবে। তেমনি হাজার হাজার একর জমি চাষাবাদে আসবে এবং প্রতি বছর এসব বাঁধ সংস্কার ও ক্ষতিগ্রস্থদের পুনবাসনে সরকারী অর্থও বেঁচে যাবে। তাই তিস্তা খনন করে স্থায়ী বাঁধ নির্মানের দাবি জানান তিনি।


    লালমনিরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সুজন বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলীকে নিয়ে বাঁধটি পরিদর্শন করেছি। দ্রুত সংস্কার করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগিদ দেয়া হয়েছে।


    লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বাঁধটি ধসে যাওয়া স্থান পরিদর্শন করে পুনসংস্কারের জন্য বরাদ্ধ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করি আসন্ন বন্যার আগেই সংস্কার করা হবে। গেল বন্যা পরবর্তি সংস্কার করে এ বছর বন্যার আগেই ধসে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নদীর কাজ এমনই। পানির স্রোতে বিলিন হতে পারে। মাটির নিচেও ধ্বসে যেতে পারে। কাজে কখনই গাফলতি ছিল না বলেও জোর দাবি করেন তিনি।


    আপনার মন্তব্য লিখুন
    © 2022 muktir71news.com All Right Reserved.
    Developed By Skill Based IT